দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

বিশ্বের বৃহত্তম ক্রিপ্টোকারেন্সি এক্সচেঞ্জ বাইন্যান্স থেকে ৬৩০ কোটি ডলারের ক্রিপ্টোকারেন্সি চুরি করেছে হ্যাকাররা। বিশ্লেষকদের ধারণা, এ ঘটনার পেছনে রয়েছে উত্তর কোরিয়া। তাঁদের মতে, এটি ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আর্থিক চুরির ঘটনা হতে পারে।
ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর ক্রিপ্টোকারেন্সির বাজারে দরপতন হয়। এদিকে অর্থ উত্তোলন সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয় বাইন্যান্স। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, গ্রাহকদের অর্থের কোনো ক্ষতি হয়নি এবং চুরি হওয়া অর্থের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে নিজস্ব তহবিল ব্যবহার করা হবে। ইতিমধ্যে চুরি হওয়া সম্পদের প্রায় অর্ধেক জব্দ করেছে স্টেবলকয়েন ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। এর মধ্যে রয়েছে এল সালভাদরভিত্তিক টেথার এবং ডোনাল্ড ট্রাম্প-সমর্থিত ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফাইন্যানশিয়াল।
বাইন্যান্স জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত সম্পদের একটি অংশ জব্দ করতে অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করছে তারা। এখন পর্যন্ত প্রায় ৩০০ কোটি ডলারের সম্পদের সন্ধান পাওয়া গেছে। শুক্রবার প্রতিষ্ঠানটি জানায়, আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে অর্থ উত্তোলন সেবা আবার চালু করার আশা করছে তারা। তবে বাকি ৩৩০ কোটি ডলারের বিষয়ে কোনো তথ্য দেয়নি।
ক্ষতি পুষিয়ে নিতে প্রায় ৬৩৪ কোটি ডলারের নিজস্ব তহবিল আলাদা করে রেখেছে বাইন্যান্স। প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইট অনুযায়ী, নিরাপত্তা লঙ্ঘনের ঘটনায় গ্রাহকদের সম্পদ সুরক্ষায় তাদের ১০০ কোটি ডলারের বিটকয়েন রিজার্ভ তহবিলও রয়েছে। বিন্যান্সের প্রতিষ্ঠাতা চ্যাংপেং ঝাও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জানিয়েছেন, প্রতিষ্ঠানটির কাছে ১০০ কোটি ডলারের বেশি মূল্যের স্পেসএক্সের শেয়ার রয়েছে।
বাইন্যান্স সহ-প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রিচার্ড টেং এক্সে দেওয়া পোস্টে বলেন, ‘আমরা কখনোই গ্রাহকদের অর্থ ব্যবহার করি না। তাই তাঁদের অর্থ ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি।’
টেং এ ঘটনাকে ‘জটিল সাইবার হামলা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর ভাষ্য, একজন ব্যক্তি নয়, বরং একাধিক পক্ষ এ হামলায় জড়িত ছিল। হামলায় একটি হ্যাক হওয়া ল্যাপটপ এবং ক্ষতিকর সফটওয়্যার ব্যবহার করা হয়। হামলার সময় নিজেদের কার্যক্রমের চিহ্ন ও প্রমাণ মুছে ফেলতে ওই সফটওয়্যার কাজ করায় ঘটনা শনাক্ত ও তদন্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
টেং জানান, লেনদেন অনুমোদনের কাজে ব্যবহৃত একটি ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে হ্যাকাররা বাইন্যান্সর নিয়ন্ত্রণাধীন ইন্টারনেট-সংযুক্ত একটি ওয়ালেট থেকে অর্থ সরিয়ে নেয়। এ ক্ষেত্রে স্বাভাবিক অনুমোদন প্রক্রিয়া এড়িয়ে লেনদেন সম্পন্ন করা হয়।
স্টেবলকয়েন ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠান টেথার জানিয়েছে, এ ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রায় ১৫৭ কোটি ডলারের সম্পদ জব্দ করেছে তারা। অন্যদিকে সার্কেল জব্দ করেছে ৮০ কোটি ডলারের বেশি।
ইতিহাসের সবচেয়ে বড় হ্যাকিং
ক্রিপ্টোকারেন্সি চুরির ধারাবাহিক ঘটনার সর্বশেষ সংযোজন এ হামলা। গবেষণা প্রতিষ্ঠান টিআরএম ল্যাবসের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর প্রায় ১৫০টি হামলায় ২৯০ কোটি ডলারের ক্রিপ্টোকারেন্সি চুরি হয়েছিল।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ব্লকচেইন বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান টিআরএম ল্যাবস ও চেইনঅ্যানালাইসিসের মতে, বৃহস্পতিবার গভীর রাতে প্রায় ২০ মিনিটের মধ্যে বাইন্যান্সর বেশির ভাগ অর্থ চুরি হয়। হামলার ধরনে উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে ওঠা আগের কয়েকটি বড় সাইবার হামলার সঙ্গে মিল রয়েছে।
টিআরএমের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, হ্যাকাররা বাইন্যান্সর ওয়ালেটগুলোকে এমনভাবে নির্দেশ দিতে সক্ষম হয়, যাতে সেগুলো থেকে অর্থ সরাসরি হ্যাকারদের নিয়ন্ত্রণাধীন ওয়ালেটে চলে যায়। ২০২৫ সালে ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ বাইবিটে চালানো বড় ধরনের হামলার সঙ্গেও এ কৌশলের মিল রয়েছে। ওই হামলার জন্য উত্তর কোরিয়াকে দায়ী করেছিল যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা এফবিআই।
টিআরএম এক বিশ্লেষণে বলেছে, তাদের ধারণা, এ হামলার পেছনে উত্তর কোরিয়ার বিশেষায়িত হ্যাকিং ইউনিট রয়েছে। টিআরএম ও চেইনঅ্যানালাইসিস—দুই প্রতিষ্ঠানই জানিয়েছে, হামলার জন্য উত্তর কোরিয়া দায়ী বলে তারা অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী।
ব্রিটিশ ব্লকচেইন বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান এলিপটিকের ভাষ্য, ‘এটি প্রায় নিশ্চিতভাবেই যেকোনো ধরনের সম্পদ চুরির মধ্যে এখন পর্যন্ত জানা সবচেয়ে বড় ঘটনা।’
যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার কর্তৃপক্ষ এবং সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, উত্তর কোরিয়া বহু বছর ধরে গুপ্তচরবৃত্তি, অর্থ চুরি ও রাজস্ব আয়ের জন্য রাষ্ট্র-সংশ্লিষ্ট সাইবার ইউনিট ব্যবহার করে আসছে। তবে উত্তর কোরিয়া বরাবরই এসব অভিযোগ অস্বীকার করে। এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে জেনেভায় দেশটির মিশন ও চীনে অবস্থিত দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
বিষয়টির সঙ্গে পরিচিত এক ব্যক্তি রয়টার্সকে জানিয়েছেন, বাইন্যান্স এ ঘটনায় এফবিআই ও যুক্তরাষ্ট্রের সিক্রেট সার্ভিসের (ইউএসএসএস) সঙ্গে কাজ করছে। এফবিআই এক বিবৃতিতে বলেছে, তারা ঘটনাটি সম্পর্কে অবগত এবং এর ব্যাপ্তি ও সম্ভাব্য প্রভাব বুঝতে সংশ্লিষ্ট সরকারি-বেসরকারি অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করছে।
ইউএসএসএস এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি। অন্যদিকে বাইন্যান্সকে প্রধান পরিচালন লাইসেন্স দেওয়া আবুধাবির ফিন্যানশিয়াল সার্ভিসেস রেগুলেটরি অথরিটি জানিয়েছে, তারা বিন্যান্সের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যোগাযোগ রাখছে এবং পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।
ক্রিপ্টোকারেন্সি বাজারে দরপতনের বিষয়ে বাজার-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান জিএসআরের আরাভিন্দ শ্রীনিবাসন বলেন, ‘এটি ইতিহাসের সবচেয়ে বড় হ্যাকিং।’
বিটকয়েনের দাম ছয় সপ্তাহের মধ্যে সর্বনিম্ন ৭৬ হাজার ৩৬৮ ডলারে নেমে যায়। ইথারের দামও ৩ শতাংশের বেশি কমে দুই মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন ২ হাজার ১৭৮ ডলারে পৌঁছায়। পরে বাজার কিছুটা স্থিতিশীল হয়। বাইন্যান্সর লেনদেন ফি পরিশোধে ব্যবহারযোগ্য ক্রিপ্টো টোকেন বিএনবির দামও গত ২৪ ঘণ্টায় ৬ দশমিক ২ শতাংশ কমে ৭০২ ডলারে দাঁড়ায়। এ ঘটনার প্রভাব পড়ে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জগুলোর শেয়ারেও।
নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ
বিশ্লেষকদের মতে, সম্পদ চুরির সম্ভাব্য ক্ষতির বাইরেও এ নিরাপত্তা লঙ্ঘনের ঘটনা পুরো ক্রিপ্টো খাতে প্রভাব ফেলতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চ সুদের হার এবং এক্সচেঞ্জ-ট্রেডেড ফান্ডের (ইটিএফ) মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের চাহিদা কমে যাওয়ায় খাতটি আগে থেকেই চাপের মুখে রয়েছে।
হ্যাশকি গ্রুপের জ্যেষ্ঠ গবেষক টিম সান বলেন, এ ঘটনা বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা আরও কমিয়ে দিতে পারে। পাশাপাশি কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালিত এক্সচেঞ্জগুলোতে রাখা সম্পদের নিরাপত্তা নিয়েও নতুন করে ভাবতে পারেন তাঁরা।
বিটকয়েনের অন্যতম পরিচিত সমর্থক বিনিয়োগকারী মাইকেল সেলর এক্সে দেওয়া পোস্টে বলেছেন, বাইন্যান্স গ্রাহকদের কোনো ক্ষতি না হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করবে বলে তিনি আশা করেন। শুক্রবার তিনি লেখেন, ‘আমাদের শিল্প এ ঘটনা থেকে শিক্ষা নেবে, নিরাপত্তা জোরদার করবে এবং আরও শক্তিশালী ও স্থিতিস্থাপক হয়ে উঠবে।’
ব্যবহারকারীদের ডিজিটাল সম্পদ কেনাবেচার সুযোগ দেওয়া বাইন্যান্সর বিশ্বজুড়ে নিবন্ধিত গ্রাহকসংখ্যা ৩৩ কোটি ৫০ লাখ। প্রতিষ্ঠানটির ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই বছর তাদের হেফাজতে থাকা সম্পদের পরিমাণ ছিল প্রায় ১৬ হাজার ২৮০ কোটি ডলার।
গত বছর আবুধাবির বিনিয়োগ গোষ্ঠী এমজিএক্স বাইন্যান্সর সংখ্যালঘু অংশীদার হয়। এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হয়নি প্রতিষ্ঠানটি।
সূত্র: রয়টার্স
এমএস/